রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২ সেপ্টেম্বর ভর্তি হোন লালন শিল্পী ফরিদা ফরিদা পারভীন
যার কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান মানুষকে ছুঁয়ে চলেছে পাঁচ দশক ধরে, যার নাম হয়েছে লালনের গানের সমার্থক, সেই সংগীত লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন আর নেই।
জাগতিক সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে তিনি পাড়ি দিয়েছেন অচিন দেশে।
শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাত সোয়া ১০টায় তার মৃত্যু হয়। ফরিদা পারভীনের বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
ফরিদা পারভীনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্তী।
আরও পড়ুনঃ পাকিস্তান ভ্রমনের নিয়মাবলী
তিনি বলেন, “রাত ১০টা ১৫ মিনিটে হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ফরিদা পারভীন।“
সবশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ফরিদা পারভীনকে। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে নেওয়ার পরই নিয়ে যাওয়া হয় আইসিইউতে। পরে তাকে লাইফ সাপোর্টেও নেওয়া হয়; সেখান থেকে আর তাকে ফেরানো যায়নি।
হাসপাতালে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদা পারভীনের মেজ ছেলে ইমাম নাহিল বলেন, রাতে তেজকুনি পাড়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে মাকে। সেখান থেকে সকাল সাড়ে ১০টায় নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জোহরের নামাজের আগে প্রথম জানাজা হবে। সেখান থেকে কুষ্টিয়ার বাড়িতে নানা-নানীর কবরে শায়িত করা হবে।
ফরিদা পারভীনের স্বামী গাজী আবদুল হাকিম হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, ছেলে-মেয়েদের ইচ্ছে অনুযায়ী তাকে কুষ্টিয়ায় দাফন করা হচ্ছে।
“সারাদেশের মানুষের কাছে ফরিদা পারভীনের জন্য দোয়া চাই। লালন সংম্রাজ্ঞী এই একজনই।”
বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। কিডনি ডায়ালাইসিস চলছিল সপ্তাহে দুদিন করে। তবে মাঝেমধ্যে অবস্থার অবনতি হত তার। চলতি বছরে তিন দফায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে।
সবশেষ হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার চিকিৎসায় ছয় সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল।
লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন
শনিবার রাতে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, “ফরিদা পারভীন দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। সম্প্রতি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে উনাকে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করাতে হত। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের অংশ হিসেবে গত ২ সেপ্টেম্বর আমাদের হাসপাতালে আনা হয় তাকে। ডায়ালাইসিসের পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেন।
“এরপর থেকে তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত বুধবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বুধবার থেকে তিনি ভেন্টিলেশনে ছিলেন।”
আগের দিন শুক্রবার এই চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, ফরিদা পারভীনের শারীরিক অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার সুযোগও নেই।
তিনি বলেছিলেন, “ফরিদা পারভীনের রক্তচাপ কিছুটা বেড়েছে, তবে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা অনেক কম, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি এবং জ্ঞানের স্তরও নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
“উনি বর্তমানে মাল্টি-অর্গান ফেইলিওরের রোগী। গতকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে ডায়ালাইসিস দেওয়ার চেষ্টা চলছে, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।”
এবারের আগে এই হাসপাতালেই গেল ৫ জুলাই ভর্তি হন ফরিদা পারভীন। সেবারও আইসিইউতে রাখা হয়। টানা দুই সপ্তাহ তখন হাসপাতালে ছিলেন তিনি। বাড়ি ফিরে চিকিৎসকের বেঁধে দেওয়া নিয়মের বেড়াজালে দিন কাটছিল তার। এরও আগে ফেব্রুয়ারিতে শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে ১৩ দিন হাসপাতালে ছিলেন এই শিল্পী।
ফরিদা পারভীনের উন্নত চিকিৎসার জন্য তার পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
তার বড় ছেলে ইমাম বলেছিলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তার মায়ের চিকিৎসার ‘সব খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না’।
লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন
লালনের গান গেয়ে ফরিদা কেবল নিজেই জনপ্রিয় হননি, এই সংগীতকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পৌঁছে দিয়েছেন। সংগীতের সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে পেয়েছেন একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা।
১৯৫৪ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর নাটোরে জন্ম নেওয়া ফরিদা বেড়ে ওঠেন কুষ্টিয়ায়। বাবা ছিলেন চিকিৎসক, মা গৃহিনী। সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া ফরিদার গানে হাতেখড়ি পাঁচ বছর বয়সে। বাবা-মায়ের উৎসাহে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেওয়া ফরিদার ইচ্ছা ছিল নজরুলসংগীতের শিল্পী হওয়ার। এগোচ্ছিলেনও সেই পথেই।
রাজশাহী বেতারে নজরুলগীতির শিল্পী হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন ১৯৬৮ সালে। গেয়েছেন আধুনিক ও দেশের গানও। তরুণ বয়সে লালনের গান একরকম ‘উপেক্ষিতই’ ছিল তার কাছে। তবে সংগীতের অন্য সব ধারাকে পাশে সরিয়ে কীভাবে, কোন তাড়নায় তিনি লালনের গানে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন সেই গল্প ফরিদা শুনিয়েছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে।
ফরিদা বলেছিলেন, স্বাধীনতার বছরখানের পর কুষ্টিয়ার ছেঁউরিয়াতে দোল পূর্ণিমার উৎসবে গুরু মোকছেদ আলী তাকে অনুরোধ করেছিলেন লালনের গান গাইতে।
তার ভাষ্য ছিল, “তখন আমি খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললাম ঠিক আছে আমাকে একটা গান শিখিয়ে দেন ৷”
এরপর ‘বড় অনিচ্ছায় কেবল গুরুর মান রাখতে’ লালনের ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান ফরিদা করেছিলেন।
ওই গানই তার শিল্পী জীবনের বাঁক বদলে দেয় ফরিদার। নিজের ভেতরে এক ধরনের ‘অনুরণন’ অনুভব করেন বলে ভাষ্য ছিল তার।
ফরিদা বলেন, “যেটা ঐশ্বরিক অনুরণন। আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমার মনে হল আমাকে এই গান আরও করতে হবে, এই গান শিখতে হবে। এরপর গুরু আমাকে একটা একটা করে গান শেখাতে লাগলেন। আর এভাবেই লালন গানের শুরু। এখন এই লালন ফকিরই আমাকে সবার প্রাণের মধ্যে উপস্থাপন করেছে। এই গান দিয়ে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন বলেই সেদিন ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটি আমাকে দিয়ে করিয়েছিলেন।”
অনেকে তাকে লালনের গানের ‘রানি বা সম্রাজ্ঞী’ বললেও, এ ধরনের উপাধি পছন্দ করতেন না ফরিদা।
তার কথায়, “এসব আমি একদমই পছন্দ করি না। কেউ যদি লালনের বাণীগুলো অন্তর থেকে আত্মস্থ করতে পারে সে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। এসব নাম দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।”
ফরিদা পারভীনের আক্ষেপ ছিল, নতুন প্রজন্ম ‘শুদ্ধভাবে লালন চর্চা করছে না’। লালনের গান উপস্থাপনার হালের প্রবণতাও ‘সঠিক নয়’ বলে তার ভাষ্য। তার মতে, হৃদয়ের গভীর উপলব্ধি থেকে লালন চর্চার কোনো বিকল্প হতে পারে না।
তিনি বলেছিলেন, “আজকাল অনেকেই লালন ফকিরের গান গাইছেন। এটা আশার কথা হলেও দুঃখজনক এই যে, এদের অনেকেই গানের বাণী ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারেন না। আবার, অনেকেরই তাল, লয় ঠিক নেই। আমরা গুরুর প্রতি ভালোবাসা থেকে গানটি গ্রহণ করার প্রয়োজন অনুভব করতাম। এখনকার অনেকের মধ্যে সেই আন্তরিকতা আর ভক্তি নেই। লালনের গানের চর্চাপ্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে আমি সংগীত একাডেমিও প্রতিষ্ঠা করেছি। আমার স্কুলের সন্তানদের শিখিয়েছি ভালোবাসা থেকে গানগুলো গ্রহণ করছে। ”
ফরিদা পারভীনের গাওয়া বেশ কয়েকটি আধুনিক ও দেশের গান জনপ্রিয় হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে ‘তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকা দির নাম’, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’। বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন এই শিল্পী।
সংগীতাঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ২০০৮ সালে জাপান সরকারের ‘ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার’ পুরস্কার পান তিনি। সেরা প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯৩ সালে।

লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন
লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন | লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন | লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন | লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন | লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন | লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন | লালন শিল্পী ফরিদা পারভীন
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।
