বাংলার প্যাডেল স্টিমার আবার ছপাত ছপাত ছন্দে বিশাল চক্রাকার প্যাডেল ঘুরতে ঘুরতে স্টিমার চলবে এদেশের নদীতে।
বাংলাদেশের নদ-নদী শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য নয়, এগুলো এ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধমনী। এই নদীপথের ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে চলা প্যাডেল স্টিমার, যা ‘রকেট স্টিমার’ নামে অমর হয়ে আছে।
রকেট স্টিমার বাংলার নৌ-ঐতিহ্যের এক অমলিন সাক্ষী। শত বছর ধরে এই স্টিমারগুলো নদীর বুকে যাত্রীদের স্বপ্ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা ও সংস্কৃতির গল্প বহন করেছে।
কমলা রংয়ের এই বিশালাকৃতি নৌযান শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বাংলার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের এক জীবন্ত প্রতীক।
সম্প্রতি, ঐতিহাসিক ‘পিএস মাহসুদ’ আধুনিক সাজে নতুন করে ঢাকা-বরিশাল রুটে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে, যা বাংলার নদী ঐতিহ্যের সঙ্গে পর্যটনের এক অনন্য মেলবন্ধন সৃষ্টি করবে।
আরও পড়ুনঃ বাড়ি করার সময় কতটুকু জায়গা ছাড়তে হয়
বাংলার প্যাডেল স্টিমার | এক ঐতিহ্যের সূচনা
উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ব্রিটিশ শাসকদের হাত ধরে বাংলার নদীপথে স্টিমারের যাত্রা শুরু হয়।
১৮২৩ সালে হুগলী নদীতে ‘ডায়না’ নামে প্রথম যাত্রীবাহী স্টিমারের যাত্রা ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। ১৮৮৪ সালে বরিশাল-খুলনা রুটে প্যাডেল স্টিমারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
এই নৌযানগুলোতে তখন ছিল কয়লাচালিত বাষ্পীয় ইঞ্জিন। আর দুই পাশে বিশাল প্যাডেল বা চাকা ঘুরিয়ে নদীর বুকে দ্রুতগতিতে ছুটে চলত। এই দ্রুতগতির কারণেই লোকজনের কাছে এগুলো ‘রকেট’ নামে খ্যাতি লাভ করে।
১৯৫৮ সালে এই স্টিমারগুলো ‘পাকিস্তান রিভার স্টিমার্স’য়ের অধীনে আসে। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) তত্ত্বাবধানে চলে আসে।
একসময় ঢাকা-কলকাতা রুটে যাতায়াতের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই স্টিমারগুলো। পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের ফলে এই রুট বন্ধ হয়ে গেলে, স্টিমারগুলো ঢাকা-খুলনা এবং পরে ঢাকা-মোড়েলগঞ্জ রুটে যাত্রা শুরু করে।
বর্তমানে প্যাডেল স্টিমার
বর্তমানে বিশ্বে মুষ্টিমেয় প্যাডেল স্টিমার টিকে আছে, আর তার মধ্যে পাঁচটি বাংলাদেশের গর্ব।
এগুলো হল— পিএস অস্ট্রিচ (১৯২৯), পিএস মাসুদ (১৯২৮), পিএস লেপচা (১৯৩৮), পিএস টার্ন (১৯৫০) এবং এমভি শেলা (১৯৫১)।
এগুলোর মধ্যে পিএস মাসুদ এবং অস্ট্রিচ- সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক।
১৯২৮ সালে কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে নির্মিত পিএস মাসুদ নদীপথের এক কালজয়ী সাক্ষী। শুরুতে কয়লাচালিত এই স্টিমারগুলো ১৯৮০-এর দশকে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তরিত হয়।
সম্প্রতি পিএস মাসুদে আধুনিক ইঞ্জিন, জিপিএস ন্যাভিগেইশন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। তবে এর ঐতিহ্যবাহী কমলা রংয়ের নকশা রাখা হয়েছে অটুট।
১৫ নভেম্বর এটি ঢাকা-বরিশাল রুটে নতুন করে যাত্রা শুরু করবে। প্যাডেল স্টিমারগুলো ঢাকার সদরঘাটের ১৬ নম্বর পল্টুন লালকুঠির ঘাট থেকে যাত্রা করত।

প্যাডেল স্টিমার শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বাংলার সংস্কৃতির এক জীবন্ত অধ্যায়
‘ওরে নীল দরিয়া’ গানে স্টিমারের রোমান্টিক চিত্র ফুটে উঠেছে, যা ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অমর হয়ে আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই স্টিমারে চড়ে বাংলার নদীপথের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন।
তবে নদীর নাব্যতা হ্রাস, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার এবং আর্থিক ক্ষতির কারণে ২০২২ সালে এই সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়।

তবে পিএস মাসুদের পুনরায় চালু হওয়া বাংলার নদী ঐতিহ্যকে নতুন করে জাগিয়ে তুলছে।
বিআইডব্লিউটিসি- পিএস মাহসুদ, পিএস অস্ট্রিচ, লেপচা ও টার্ন স্টিমারগুলো পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছে। এই স্টিমারগুলো পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।
নদীপথে এই যাত্রা দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে বাংলার প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা উপহার দেবে।
বিআইডব্লিউটিসি মহাব্যবস্থাপক (কার্গো ও ফেরী) মো. আজমল হোসেন এই বিষয়ে বলেন, “ভাড়া এখনও চুড়ান্ত হয়নি। তবে ভাড়া নির্ধারনের কাজ চলছে।”
প্যাডেল স্টিমার বাংলার নদীপথের এক কালজয়ী গাথা। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যের এই মিশেল নতুন প্রজন্মকে বাংলার গৌরবময় অতীতের সঙ্গে সংযুক্ত করবে, এবং পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
নদীর ঢেউয়ে ভেসে চলা এই স্টিমারগুলো যেন বাংলার হৃদয়ের স্পন্দন, যা চিরকাল ধরে রাখতে হবে।
তথ্য সূত্রঃ bdnews24
Tag: বাংলার প্যাডেল স্টিমার
Key: বাংলার প্যাডেল স্টিমার
বাংলার প্যাডেল স্টিমার | বাংলার প্যাডেল স্টিমার
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।
