ঢাকারবিবার, ২৫শে জানুয়ারি, ২০২৬

নফস ও রূহ : ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর বিশ্লেষণ

DinBarta
সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৫ ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
শেয়ার করুন:-
Link Copied!

নফস ও রূহ

মানুষের অস্তিত্ব কেবল দেহের সমষ্টি নয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যাতে তার ভেতরে রয়েছে দেহ, আত্মা, নফস (প্রবৃত্তি) এবং রূহ (আত্মা বা স্পিরিট)। ইসলামি আধ্যাত্মিকতায় নফস ও রূহ হলো দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা মানুষের ইমান, আমল, চরিত্র ও আধ্যাত্মিক অগ্রগতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। নফস মানুষকে নিচের দিকে টানে—প্রবৃত্তি, কামনা ও শয়তানি প্ররোচনার দিকে। অপরদিকে রূহ মানুষকে ওপরে টানে—আল্লাহর নৈকট্য, ইবাদত ও আধ্যাত্মিক শান্তির দিকে।

আরও পড়ুনঃ ইসলাম ক্রমবিকাশের সময় নারী চিকিৎসক

নফসের ধারণা

নফস শব্দের অর্থ হলো সত্তা, প্রাণ, মন বা প্রবৃত্তি। কুরআনে নফসকে নানা অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হলো—মানুষের ভেতরের কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তির কেন্দ্র।

কুরআনে নফস

আল্লাহ বলেন:

“নিশ্চয়ই নফস তো মন্দের দিকে প্রলুব্ধ করে।” (সূরা ইউসুফ: ১২:৫৩)

এখানে স্পষ্ট বোঝা যায় যে নফস মানুষের মধ্যে একটি স্বভাবগত প্রবণতা, যা তাকে খারাপের দিকে ঠেলে দেয় যদি তা নিয়ন্ত্রণে না রাখা হয়।

নফসের প্রকারভেদ

ইসলামি তাসাওউফে সাধারণত নফসকে তিন প্রকারে ভাগ করা হয়:

  1. নফসুল আম্মারাহ (أمّارة بالسوء)
    • সর্বদা মন্দের দিকে টানে।
    • উদাহরণ: হিংসা, গীবত, ব্যভিচার, মদ, অহংকার।
  2. নফসুল লাওয়ামাহ (لوّامة)
    • ভুল করলে অনুতপ্ত হয়, আত্মধিক্কার দেয়।
    • এই স্তরে মানুষ ভালো-মন্দের দ্বন্দ্বে থাকে।
  3. নফসুল মুতমাইন্নাহ (مطمئنّة)
    • শান্ত, প্রশান্ত নফস।
    • আল্লাহ বলেন: “হে প্রশান্ত নফস! তুমি তোমার প্রভুর দিকে ফিরে যাও, তিনি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট এবং তুমি তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট।” (সূরা ফজর: ৮৯:২৭-২৮)

নফসের রোগ

নফসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি মানুষকে গাফেল করে তোলে। প্রধান রোগগুলো হলো—

অহংকার ও আত্মম্ভরিতা

হিংসা ও বিদ্বেষ

লোভ ও কৃপণতা

কামনা ও প্রবৃত্তির দাসত্ব

রিয়া (দেখানোর জন্য আমল করা)

নফস পরিশুদ্ধির উপায়

তাওবা ও ইস্তেগফার: আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা চাওয়া।

রোজা: প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনে।

সাবর: কষ্ট সহ্য করে ধৈর্য ধরা।

মুজাহাদা: নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।


আরও পড়ুনঃ জমজম কূপের রহস্য

রূহের ধারণা

রূহ হলো মানুষের আসল সত্তা। এটি আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টির অংশ, যার রহস্য কেবল আল্লাহই জানেন।

কুরআনে রূহ

আল্লাহ বলেন:

“তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, রূহ আমার প্রভুর আদেশ থেকে, আর মানুষের কাছে অল্প জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” (সূরা আল-ইসরা: ১৭:৮৫)

এ থেকে বোঝা যায় রূহ এমন এক সত্তা যা মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে।

রূহের বৈশিষ্ট্য

রূহ আল্লাহর আদেশে দেহে প্রবেশ করে।

রূহ ছাড়া দেহ মৃত ও নিথর।

মৃত্যুর সময় রূহ বের করে নেওয়া হয়।

রূহ পরকালে আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে।


নফস ও রূহের দ্বন্দ্ব

মানুষের ভেতরে নফস ও রূহের মধ্যে এক চিরন্তন সংগ্রাম চলে।

নফস চায় নিচে নামাতে – জাগতিক লোভ, কামনা, শয়তানি প্ররোচনার দিকে।

রূহ চায় ওপরে তুলতে – আল্লাহর ইবাদত, তাকওয়া, সচ্চরিত্রের দিকে।

এই দ্বন্দ্বেই মানুষের পরীক্ষা। যদি কেউ নফসকে জয় করতে পারে, তবে রূহ শক্তিশালী হয় এবং সে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে।

নফস ও রূহের সম্পর্ক

নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনলে রূহ আলোকিত হয়।

নফস যখন প্রবৃত্তির দাস, তখন রূহ দুর্বল হয়ে পড়ে।

নফস যদি প্রশান্ত (মুতমাইন্নাহ) হয়, তবে রূহ শান্তি পায়।

রূহকে শক্তিশালী করার উপায়

নামাজে খুশু: আল্লাহর সামনে বিনয় প্রকাশ।

তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল: রাতে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া।

কুরআন তিলাওয়াত: রূহের জন্য নূরের খাদ্য।

জিকির ও দোয়া: অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে জীবিত রাখা।

ইখলাস: কেবল আল্লাহর জন্য আমল করা।

সুফি দৃষ্টিকোণ

সুফি আলেমরা বলেন, নফস হলো “পশু”, আর রূহ হলো “ফেরেশতা”। যদি মানুষ নফসকে ছাড় দিয়ে দেয় তবে সে পশুত্বে নেমে যায়। আর যদি রূহকে অনুসরণ করে তবে সে ফেরেশতার মতো হয়ে যায়।

নফস ও রূহ মানুষের ভেতরের দুই বিপরীত শক্তি। নফস মানুষকে নিচে নামাতে চায়, আর রূহ মানুষকে আল্লাহর দিকে টেনে নেয়। প্রকৃত মুমিন সেই, যে নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং রূহকে শক্তিশালী করে। আল্লাহর নৈকট্য, প্রশান্তি ও জান্নাত লাভের জন্য নফসকে পরিশুদ্ধ করা এবং রূহকে আল্লাহর নূরে আলোকিত করাই হলো মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।